যেদিন লাবণী কেঁদেছিল
লিখেছেন লাবণী
একটু আগে লাবনী গেলো । রিকশায়
করে , লাল জামা পড়ে । প্রতিদিনই
অরণ্য
দারিয়ে থাকে লাবনীকে এক ঝলক
দেখার আশায় । তবে ভাব করে যেন
কোথাও যাচ্ছে । এই নিয়ে ৭ম বার
হল , মুখ ফুটে "কোথায় যাও"
ছাড়া আর কিছু বলতে পারলনা ।
অনেক কিছু বলার ছিল লাবনীকে ,
এক ঝলক দেখলে অরণ্য মন কেমন
অশান্ত হয়ে উঠে ।
অশান্তিকে তো খারাপ লাগার
কথা । কিন্তু এই অশান্তিকে অরণ্যর
ভালই লাগে । কেমন যেন একটা মধুর
জ্বালাতন থাকে সারাটাদিন ।
হয়ত একেই ভালবাসা বলে।
আজ পহেলা বৈশাখ , ১৪ই এপ্রিল ।
হিসাবমতে আজ বাংলা নববর্ষ ।
কিন্তু এই দিনকে আজকাল কেন
জানি অরণ্যর কাছে ভ্যালেন্টাইন্স
ড্যা এর মত মনে হয় । মা - বাবার চোখ
ফাকি দিয়ে মেয়েরা লাল
শাড়ি পড়ে আর
ছেলেরা পাঞ্জাবি পড়ে
রিকশায় করে ঘুরাঘুরি করে । এই
দিনে আপনি রিক্সার
দিকে তাকান , দেখবেন
৪টা রিক্সার মধ্যে ৩টাতেই একজন
তরুন এবং একজন তরুনি হাত ধরে একজন
আরেকজনের দিকে অপলক
দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে । দুইজনের
চোখ দিয়েই অনেক
কথা বলা হয়ে যায় । সব প্রেম প্রকাশ
হয়ে যায় চোখের পাতায়
বেড়িয়ে আসার আপ্রান চেষ্টায়
থাকা দু ফুটা চোখের জল । এই প্রমের
দৃশ্যগুলা দেখতেও একটা অন্যরকম
আনন্দ আছে । কেও মনে হয় সত্যি ই
বলেছেন " প্রেম স্বর্গ থেকে আসে "
।
অরন্য তাই এই দুই নম্বর
ভালবাসা দিবসকেই
ভালবাসা নিবেদনের জন্য পছন্দ
করে নিলো । সে হ্যা করুক আর নাই
করুক । অরন্যর হাতের লাল গোলাপ
ছুড়ে মারুক মুখের উপর , বাম হাত
দিয়ে সবার সামনে চড় মারুক তবুও শুধু
লাবনীকে জানাতে চায় যে এই
পৃথিবীতে একজন আছে যে তার
জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত
লাবনীকে ভালবাসবে । বুকের
গভিরোতম অংশ থেকে রক্তক্ষরণ
হবে শুধু তার ভালবাসার জন্য ।
লাবনীকে অরন্য হয়তো কখনও
ভালবাসি বলত নাহ । ওর ভয়
যদি লাবণী ওকে ভুল বুঝে ? ও
যদি বলতে না পারে যে ও
লাবনীকে কি রকম
ভাবে ভালবাসে তাহলে তো ওর
প্রেম বৃথা যাবে ।
হয়তো লাবণী বুঝবেনা অরন্যের এই
হৃদয়ের প্রতিটি হৃদস্পন্দন কেমন
করে ভালবাসি ভালবাসি করে
হাহাকার করে । কিন্তু সেদিন
আমি ওকে বললাম
যে এইরকমে লুকিয়ে লুকিয়ে আর
কতদিন ভালবাসবি ? এই রকম "কেহ
দেখিবে না মোর গভির প্রণয় , কেহ
জানিবে না মোর অশ্রুবারিচয় " আর
কত করবি ?
গিয়ে বলে দে না গাধা । এত ভয়
কিসের ?
অরন্যঃ "কিন্তু তানিয়া , ও
যদি না করে তাহলে ?"
আমি বললাম (তানিয়া)
"না করলে করবে । কিন্তু মনের
কথা এর জন্য গোপন রাখবি?"
অরন্যঃ "তর কথাও ঠিক ।
বলতে হবে আমাকে । আমার প্রেম
সত্যি হলে অবশ্যই হ্যা করবে । "
এই হল অরন্যর প্রেম নিবেদনের
সাহসের জোগান ।
জোগানদাতা হলাম আমি ,
তানিয়া ।
" আমি তোমাকে ভালবাসি" ,
পৃথিবীর
মধ্যে সবচেয়ে বেশি বলা কথা ।
সবচেয়ে কঠিন কথাও মনে হয়।
এবং অবশ্যই সবচেয়ে সুন্দর কথা । যতই
ভালবাস না কেন ,
ভালবাসি বলা ততটাই কঠিন । যত
বেশি ভালবাস, তত
বেশি হারানোর ভয় । আজকের জন্য
অরন্যর সব ভয় দূরে থাক ।
আজকে অরন্যকে বলতেই হবে ,
হয়তো কাল কখনো আসবেনা ।
লাবনীকে দেখা যাচ্ছে । পুকুরের
স্বচ্ছ পানিতে নৌকায়
পা দুটো দুলিয়ে খিলখিলিয়ে
হাসছে । কতো সুন্দর হাসি । শুধু এই
হাসিটা সারাজিবন দেখার জন্য
অরন্য নিজের জীবন
দিয়ে দিতে পারবে । এই হাসির
জন্য অরণ্যর জীবন দিতেও
কনো আফসোস নেই । অরণ্য
পাঞ্জাবির পকেট থেকে লাল
গোলাপটা বের করল । লাবণী এখন
নৌকা থেকে নামল । অরন্যকে এখন
সেই তিনটা শব্দ বলা লাগবে ।
লাবণী নৌকা থেকে নেমে
ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে
মাঠের সবুজ ঘাসের উপর দিয়ে ।
গোলাপ হাতে নিয়ে অরণ্যও
আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছে
লাবনীর দিকে । ধুপপপপ !!!
কাহিনিতে নতুন চরিত্রের প্রবেশ !
রোহিত ।
লাবণী অরণ্যর কাছাকাছি আসার
আগেই রোহিতের হাত
ধরে চলে গেলো ।
হয়তো একেবারেই চলে গেলো ।
অরন্যর হাতের লাল গোলাপ
নিচে পড়ে গেলো । শরীর ভরশুন্য
হয়ে গেলো ।
গোলাপটা তুলতে চাইল অরণ্য । আর
যাই হোক প্রথম প্রেমের প্রথম
গোলাপ তো ।
লাবণীকে ভালবাসার
স্মৃতি জড়িয়ে আছে এতে । হয়তো এই
গোলাপ নিয়েই সারাজীবন
বেঁচে থাকতে হবে , সারাজীবন ।
তিন দিন পরঃ
তো কি হয়েছে লাবণী অন্য
কাওকে ভালবাসে ? অরণ্যও বাসে ।
সবচেয়ে বেশি বাসে । লাবণী অন্য
কাউকে ভালবাসে তারমানে এই
না যে অরন্যকে ভুলে যেতে হবে ।
অরন্যর ভালবাসা অরন্য অবশ্যই প্রকাশ
করবে । লাবণী হ্যা করুক আর নাই করুক ,
শুধু জানাতে চায় যে এই
পৃথিবীতে অরন্যর শেষ নিশ্বাস
পর্যন্ত অরন্য লাবনীকে ভালবাসবে ।
প্রেম নিবেদনের জন্য সেই সাহস
এখন আর অরন্যর মনে নেই । তাই এক
বোতল ভোদকা গলাধঃকরণ করলো ।
অরন্য এখন লাবনির দুইতালা বাসার
বারান্দার
গ্রিলে ধরে দাঁড়িয়ে আছে । চোখ
লাল হয়ে আছে , মাথার চুল
উশকোখুশকো হয়ে আছে । হাত
এবং শরীর ক্রমাগতভাবে কাপছে ।
যেকোনো সময়
পড়ে যেতে পারে দুইতালা থেকে
নিচে ।
আগে থেকে কুড়িয়ে আনা ঢিল
লাবনীর কাছের
আলমারিতে মারলো ।
সরাসরি লাবনীর
গায়ে মারতে পারতো কিন্তু
লাবনীকে আঘাত করা অরন্যর
পক্ষে সম্ভব না । লাবণী ঘুম
থেকে উঠলো । তারপর চিৎকার
দিতে গিয়েও মুখ
সামলিয়ে আস্তে আস্তে
বারান্দায় চলে আসল ।
লাবনিঃ এত রাতে বারান্দায়
ঝুলতেছ কেন ? সমস্যা কি ?
অরন্যঃ সমস্যা একটাই । তোমার
কথা কখনই ভুলতে পারি না ।তোমার
প্রেমে পড়ে গেছি । যেখানেই
তাকাই শুধু তুমি আর তুমি । যেখানেই
যাই শুধু তোমার হাত খুঁজি ধরার জন্য ।
পড়তে বসলে তোমার
কথা মনে পরে । আর যখন সবকিছু বাদ
দিয়ে ঘুমাতে যাই তখন
তুমি স্বপ্নে এসেও হানা দাও ।
এসে সেই ভুবন ভুলানো হাসি দাও
আমার দিকে তাকিয়ে ,
আমি তো তখনই প্রেমে পড়ে যাই ।
লাবণীঃ অরন্য
তুমি জানো রোহিতের
সাথে আমার রিলেশন আছে ।
তাহলে এই পাগলামির মানে কি ?
অরন্যঃ কারন
আমি তোমাকে ভালবাসি । ওই
রোহিত থেকে অনেক
বেশি ভালবাসি । সবার
থেকে বেশি । তোমাকে প্রথম
দেখাতেই প্রেমে পড়ে যাই ।
তুমিই প্রথম প্রেম , তুমিই শেষ ।
লাবনিঃ প্রথম প্রেম বলতে কিছু
নেই । প্রেম বারবার হতে পারে ।
অরন্যঃ তাও ঠিক । আমার
জীবনে প্রেম একটাই । কিন্তু
ফিরে আসে বারবার । যতবার
তোমাকে ভুলে যেতে চাই , ততবার
আরো বেশি করে প্রেমে পড়ি ।
লাবনিঃ অরণ্য , তুমি আমার ভাল বন্ধু
। তোমার ভালর জন্যই বলছি ।
আমাকে ভালবেসে কোন লাভ
হবে নাহ । শুধু কষ্টই পাবে । তাই ভাল
হয় যদি ভুলে যেতে পারো ।
অরন্যঃ দি লাভ ক্ষতি হিসাব
করে প্রেমে পড়তাম
তাহলে তো আর
তোমাকে ভালবাসতাম না ।
তোমার ওই চোখ দুটা , ওই
হাসিটা আমাকে প্রেমে ফেলে
দিয়েছে । এই প্রেম
থেকে আমি কি পাব
তা কখনো চিন্তা করি নি ।
চিন্তা করতে চাইও না । আমি শুধু
জানি যে লাবণী নামের
একটা মেয়েকে আমার জীবনের সব
প্রেম , ভালবাসা দিয়ে দিয়েছি ।
পারলে আমার এই জীবনটাও
দিয়ে দিতাম । একবার এই প্রান
চেয়ে দেখো , জায়গায়
দাঁড়িয়ে থেকে তোমার হাতে এই
প্রান তুলে দিব ।
লাবনিঃ বাসায় গিয়ে একটা ঘুম
দাও । সকালে উঠে দেখবে সব
পাগলামি চলে গেছে । এই
এইজে প্রেম হয় না , এটা শুধু
কিছুদিনের ইমোসন । কয়েকদিন
পরে চলে যাবে ।
অরন্যঃ ( লাফ দিয়ে নিচে নেমে ,
চিৎকার করতে করতে ) লাবণী , শুধু
জানাতে এসেছিলাম আমার মনের
কথা । শুধু জানাতে এসেছিলাম
যে এই পৃথিবীতে কেউ একজন তার
শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত
তোমাকে ভালবাসবে । তুমি চাও
না চাও আমি তোমাকে ভালবাসব
। এর কারন এই না যে অন্য কোন
মেয়ে পাই না । এর কারন এই
যে তুমি আমার প্রথম প্রেম ,
এবং শেষ । মরার আগ মুহূর্তেও বলব
"লাবণী আমি তোমাকে ভালবাসি
" , আই প্রমিস ।
লাবনিঃ টাটা।
অরন্যঃ নেভার স্যা নেভার
লাবণী । এই জীবন অনেক বড় । একবার
না একবার তো দেখা হয়েই যাবে ।
তিন বছর পরঃ
আমরা পিকনিকে যাচ্ছি ।
কক্সবাজার থেকে এখন সেন্ট
মার্টিন যাচ্ছি । ৩০ জন
ছাত্রছাত্রী এবং ২০ জন শিক্ষক ।
সাথে আমি, অরণ্য , রোহিত
এবং লাবণী । হ্যা , লাবনীকে অরণ্য
এখনো ভালবাসে । এখনো লাবনীর
রোহিতের সাথে সম্পর্ক আছে ।
কিন্তু এখন আরো অনেক
বেশি ভালবাসে । এখনও এক মুহূর্তের
জন্য লাবণী অরণ্যর মন থেকে যায়
না । ও অরন্যকে ভালবাসুক না বাসুক
অরণ্যর ভালবাসা দিন দিন বেড়েই
যাচ্ছে ।
রোহিত আর
লাবনীকে দেখা যাচ্ছে । লঞ্চের
ছাদের উপর । ওরা টাইটানিকের
পোজ দিতে চাইছে । অরন্য
আমাকে বলল " গাধায় এটাও
জানে না যে টাইটানিকের
পোজে ছেলেকে পিছনে
দাড়াতে হয় " । আরে ওরা কোথায়
যাচ্ছে ? একেবারে লঞ্চের উপরের
ছাদে চলে গেলো ওরা । কেউ নেই
ওইখানে । জায়গাটা একটু বিপদজনক ।
লাবনীর হাত ধরে রোহিত একবার
ওকে ঘুরাল । ওরা নাচছে ।
আস্তে আস্তে নাচার
গতি বাড়তে থাকল । রোহিত
লাবনীর হাত
ধরে ঘুরিয়ে বামদিকে নিলো
তারপর অন্যহাত দিয়ে আবার
সামনে আনলো । তারপর একহাত
দিয়ে দূরে ঠেলে দিয়ে আবার
কাছে আনলো ।
কাছে এনে লাবনীকে কোলে
নিতে চাইলো । রোহিত ভারসাম্য
রাখতে পারলনা । রোহিত
ধাক্কা খেয়ে পিছনে সরে গেলো
। তারপর রোহিত ঘুরে গেলো । ওর
সামন চলে গেলো রেলিঙের
দিকে । লাবণী এখনও রোহিতের
কোলে । রেলিঙে রোহিতের
হাত ঝারি খেলো । রোহিত
হাতে ব্যাথা পেয়ে লাবনীকে
হাত থেকে ছেড়ে দিলো । নাহ !!!
লাবণী সোজা তিনতলা থেকে
একেবারে নিচে পানিতে পড়ে
গেলো । "রোহিত" , রোহিত" ,
বলে চিৎকার করতে থাকল । রোহিত
নিচে নেমে গেলো । ৩০ জন ছাত্র
ছাত্রি এবং ২০ জন শিক্ষকের সবাই
রেলিঙের পাশে চলে এল ।
লাবণী শ্বাস নিতে পারছেনা ।
একবার ডুবছে আবার ভাসছে । এখনও
লাবণী "রোহিত , রোহিত"
বলে চিৎকার করছে । আর রোহিত
চিৎকার করছে "কেউ
লাবনীকে বাচাও , কেউ একজন
বাচাও" । তারপর আরেকটা ঝাপের
শব্দ শুনলাম । দুইতলা থেকে কেউ
একজন ঝাপ দিয়েছে ।
হয়তো রোহিতের চিৎকার শুনেই
লাফ দিয়েছে । নাহ , যে লাফ
দিয়েছে সে রোহিতের চিৎকার
শুনে লাফ দেয় নি । সে লাফ
দিয়েছে তার ভালবাসার জন্য ।
অরন্য দুইতলা থেকে লাফ
দিয়েছে পানিতে । আর আমার
মাথায় শুধু একটা কথাই এল "অরণ্য
সাতারের কিছুই জানে না" ।
৭ দিন পর: অরণ্য এখনো কোমায়
আছে । ডাক্তার বলেছেন ওর
ফুসফুসে নাকি পানি ঢুকেছে ।
পানি না বের করলে ওর শ্বাস
নিতে সমস্যা হবে । আবার কোমায়
থাকলে অপারেশনও
করা যাবে না । যখন
কোমা থেকে ফিরে আসবে ঠিক
তখনই অপারেশন করা লাগবে ।
লাবণী এই সাত দিন
ধরে হাসপাতালে বসে ছিল ।
আমি যখন খাবার নিয়ে ওর
কাছে আসলাম , ও আমাকে বলল , "
আমি একটু অরণ্যকে দেখতে পারব ? " ।
আমি কিছুক্ষন ওর চোখের
দিকে তাকিয়ে রইলাম । ওর
চোখে যা দেখলাম তা কখনও
আগে ওর চোখে দেখিনি ।
রোহিতের সাথে থাকার সময়
তো কখনোই দেখি নি ,
দেখেছিলাম শুধুই বিভ্রান্তি ।
আজকে দেখলাম অন্য কিছু , পবিত্র ।
লাবণী অরণ্যের বেডের
পাশে বসে আছে । অরণ্য জীবন মৃত্যুর
মধ্যে । আর লাবণী নেই ওর নিজের
মধ্যে । লাবণী কথা বলা শুরু করল ।
অরণ্য , জানি না তুমি কোন সময়
জেগে উঠবে । যত দেরিই কর
না কেন , আমি তোমার অপেক্ষায়
থাকব । তোমাকে অনেক কিছু বলার
আছে , অনেক কিছু অরন্য । ৩ বছর
আগে তুমি বারান্দায়
ঝুলে যে কথা গুলো বলেছিলে আর
আমি হেসেছিলাম সেই
কথা গুলো আজকে তোমাকে বলতে
চাই । এই রকম অনুভূতি আমার কখনও হয়
নি । কি রকম একটা ব্যাথা মনের
ভিতর । কিছু একটা হারানোর ভয়
সারাক্ষন । আমি এই ব্যাথা নিয়ে ২
দিনও থাকতে পারবনা । তুমি ৩ বছর
ধরে কিভাবে থাকলে ? এই অরন্য ,
শুনছো ? শুধুমাত্র ভালবাসলেই এই
ব্যাথা সহ্য করা যায় ।
আমি কি করতে পারব ?
অরন্য জেগে উঠল ।
আস্তে আস্তে বলল , " লাবণী ভাল
আছো ? "
লাবণী কেঁদে ফেলল । অশ্রু
লোকানোর
কোনো চেষ্টা করলনা ।
অরন্যঃ আমি তো শুধু কেমন আছ
জিজ্ঞেস করলাম । এতে কাঁদার
কি হল ?
লাবনীঃ ( নিশ্চুপ ) ।
অরন্যঃ "লাবনী , আমি বলেছিলাম
না আমি তোমাকে জীবনের শেষ
মুহূর্ত পর্যন্ত ভালবাসবো ?
আমি আমার
কথা রেখেছি লাবণী । আমি এখনও
তোমাকে ভালবাসি ।
লাবণী শেষবারের মত বলি ,
আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি ।
যাই লাবণী , ভাল থেকো " ,
বলে অরণ্য লাবণীর
গালে আস্তে করে একটু হাত
দিয়ে ছুঁতে চাইল । লাবণী গাল
বাড়িয়ে দিলো । কিন্তু অরণ্যর হাত
লাবণীর গাল স্পর্শ করার আগেই
থেমে গেলো ।
অরণ্যকে মরে গিয়ে প্রমাণ করতে হল
যে সে ঠিকই
লাবণীকে ভালবাসে ।
তিন দিন পরঃ আমি লাবনীর
বাসায় গেলাম । লাবণী ওর
রুমে দরজা লাগিয়ে বসে আছে ।
আমি ঢুকলাম রুমে । " লাবণী , অরন্য
মারা যাবার পর ওর বেডে এই
ডায়রিটা ছিল । এর শেষ পৃষ্ঠায়
লেখা ছিল যে ডায়রিটা যেন
তোমাকে দেয়া হয় । তাই
দিতে আসলাম " , বলে আমি হাত
বাড়ালাম ।
লাবণী আমার হাত
থেকে ডায়রিটা নিলো । প্রথম
পাতা উল্টানোর পরেই সেই লাল
গোলাপটা দেখতে পেলো যা
হাতে নিয়ে অরন্য
লাবনীকে প্রেম নিবেদন
করতে চেয়েছিল । গোলাপ
মজে গেছে কিন্তু গোলাপের
মধ্যে গন্ধ রয়ে গেছে । তিন বছর
আগের গোলাপ এখনো গন্ধ
রয়ে গেছে !
লাবণী গোলাপটাকে নাকের
কাছে নিয়ে তীব্রভাবে গন্ধ
নিতে চাইল । তারপর চোখ বন্ধ
করে ফেললো । চোখ যখন খুলল তখন দুই
ফোটা অশ্রু লাবণীর গাল
বেয়ে ঝরে পড়ল । লাবণী পড়তে শুরু
করল । প্রথম লাইন এইভাবে শুরু হল " একটু
আগে লাবনী গেলো । রিকশায়
করে , লাল জামা পড়ে ......... " ।
লাবনীর চোখ বেয়ে আবারও
পানি ঝরল । এবার
আরো বেশি পরিমাণে ।
লাবনী ডায়রিটাকে বুকের
কাছে নিয়ে শক্ত
করে ধরে কেঁদে উঠল ।
লাবণী কান্না থামাতে চাইল
না । আজ যত অশ্রু ঝরার ঝরবে । আজ
লাবনীর কাঁদার দিন । লাবণী আজ
কাঁদবে ।
লিখেছেন লাবণী
একটু আগে লাবনী গেলো । রিকশায়
করে , লাল জামা পড়ে । প্রতিদিনই
অরণ্য
দারিয়ে থাকে লাবনীকে এক ঝলক
দেখার আশায় । তবে ভাব করে যেন
কোথাও যাচ্ছে । এই নিয়ে ৭ম বার
হল , মুখ ফুটে "কোথায় যাও"
ছাড়া আর কিছু বলতে পারলনা ।
অনেক কিছু বলার ছিল লাবনীকে ,
এক ঝলক দেখলে অরণ্য মন কেমন
অশান্ত হয়ে উঠে ।
অশান্তিকে তো খারাপ লাগার
কথা । কিন্তু এই অশান্তিকে অরণ্যর
ভালই লাগে । কেমন যেন একটা মধুর
জ্বালাতন থাকে সারাটাদিন ।
হয়ত একেই ভালবাসা বলে।
আজ পহেলা বৈশাখ , ১৪ই এপ্রিল ।
হিসাবমতে আজ বাংলা নববর্ষ ।
কিন্তু এই দিনকে আজকাল কেন
জানি অরণ্যর কাছে ভ্যালেন্টাইন্স
ড্যা এর মত মনে হয় । মা - বাবার চোখ
ফাকি দিয়ে মেয়েরা লাল
শাড়ি পড়ে আর
ছেলেরা পাঞ্জাবি পড়ে
রিকশায় করে ঘুরাঘুরি করে । এই
দিনে আপনি রিক্সার
দিকে তাকান , দেখবেন
৪টা রিক্সার মধ্যে ৩টাতেই একজন
তরুন এবং একজন তরুনি হাত ধরে একজন
আরেকজনের দিকে অপলক
দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে । দুইজনের
চোখ দিয়েই অনেক
কথা বলা হয়ে যায় । সব প্রেম প্রকাশ
হয়ে যায় চোখের পাতায়
বেড়িয়ে আসার আপ্রান চেষ্টায়
থাকা দু ফুটা চোখের জল । এই প্রমের
দৃশ্যগুলা দেখতেও একটা অন্যরকম
আনন্দ আছে । কেও মনে হয় সত্যি ই
বলেছেন " প্রেম স্বর্গ থেকে আসে "
।
অরন্য তাই এই দুই নম্বর
ভালবাসা দিবসকেই
ভালবাসা নিবেদনের জন্য পছন্দ
করে নিলো । সে হ্যা করুক আর নাই
করুক । অরন্যর হাতের লাল গোলাপ
ছুড়ে মারুক মুখের উপর , বাম হাত
দিয়ে সবার সামনে চড় মারুক তবুও শুধু
লাবনীকে জানাতে চায় যে এই
পৃথিবীতে একজন আছে যে তার
জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত
লাবনীকে ভালবাসবে । বুকের
গভিরোতম অংশ থেকে রক্তক্ষরণ
হবে শুধু তার ভালবাসার জন্য ।
লাবনীকে অরন্য হয়তো কখনও
ভালবাসি বলত নাহ । ওর ভয়
যদি লাবণী ওকে ভুল বুঝে ? ও
যদি বলতে না পারে যে ও
লাবনীকে কি রকম
ভাবে ভালবাসে তাহলে তো ওর
প্রেম বৃথা যাবে ।
হয়তো লাবণী বুঝবেনা অরন্যের এই
হৃদয়ের প্রতিটি হৃদস্পন্দন কেমন
করে ভালবাসি ভালবাসি করে
হাহাকার করে । কিন্তু সেদিন
আমি ওকে বললাম
যে এইরকমে লুকিয়ে লুকিয়ে আর
কতদিন ভালবাসবি ? এই রকম "কেহ
দেখিবে না মোর গভির প্রণয় , কেহ
জানিবে না মোর অশ্রুবারিচয় " আর
কত করবি ?
গিয়ে বলে দে না গাধা । এত ভয়
কিসের ?
অরন্যঃ "কিন্তু তানিয়া , ও
যদি না করে তাহলে ?"
আমি বললাম (তানিয়া)
"না করলে করবে । কিন্তু মনের
কথা এর জন্য গোপন রাখবি?"
অরন্যঃ "তর কথাও ঠিক ।
বলতে হবে আমাকে । আমার প্রেম
সত্যি হলে অবশ্যই হ্যা করবে । "
এই হল অরন্যর প্রেম নিবেদনের
সাহসের জোগান ।
জোগানদাতা হলাম আমি ,
তানিয়া ।
" আমি তোমাকে ভালবাসি" ,
পৃথিবীর
মধ্যে সবচেয়ে বেশি বলা কথা ।
সবচেয়ে কঠিন কথাও মনে হয়।
এবং অবশ্যই সবচেয়ে সুন্দর কথা । যতই
ভালবাস না কেন ,
ভালবাসি বলা ততটাই কঠিন । যত
বেশি ভালবাস, তত
বেশি হারানোর ভয় । আজকের জন্য
অরন্যর সব ভয় দূরে থাক ।
আজকে অরন্যকে বলতেই হবে ,
হয়তো কাল কখনো আসবেনা ।
লাবনীকে দেখা যাচ্ছে । পুকুরের
স্বচ্ছ পানিতে নৌকায়
পা দুটো দুলিয়ে খিলখিলিয়ে
হাসছে । কতো সুন্দর হাসি । শুধু এই
হাসিটা সারাজিবন দেখার জন্য
অরন্য নিজের জীবন
দিয়ে দিতে পারবে । এই হাসির
জন্য অরণ্যর জীবন দিতেও
কনো আফসোস নেই । অরণ্য
পাঞ্জাবির পকেট থেকে লাল
গোলাপটা বের করল । লাবণী এখন
নৌকা থেকে নামল । অরন্যকে এখন
সেই তিনটা শব্দ বলা লাগবে ।
লাবণী নৌকা থেকে নেমে
ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে
মাঠের সবুজ ঘাসের উপর দিয়ে ।
গোলাপ হাতে নিয়ে অরণ্যও
আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছে
লাবনীর দিকে । ধুপপপপ !!!
কাহিনিতে নতুন চরিত্রের প্রবেশ !
রোহিত ।
লাবণী অরণ্যর কাছাকাছি আসার
আগেই রোহিতের হাত
ধরে চলে গেলো ।
হয়তো একেবারেই চলে গেলো ।
অরন্যর হাতের লাল গোলাপ
নিচে পড়ে গেলো । শরীর ভরশুন্য
হয়ে গেলো ।
গোলাপটা তুলতে চাইল অরণ্য । আর
যাই হোক প্রথম প্রেমের প্রথম
গোলাপ তো ।
লাবণীকে ভালবাসার
স্মৃতি জড়িয়ে আছে এতে । হয়তো এই
গোলাপ নিয়েই সারাজীবন
বেঁচে থাকতে হবে , সারাজীবন ।
তিন দিন পরঃ
তো কি হয়েছে লাবণী অন্য
কাওকে ভালবাসে ? অরণ্যও বাসে ।
সবচেয়ে বেশি বাসে । লাবণী অন্য
কাউকে ভালবাসে তারমানে এই
না যে অরন্যকে ভুলে যেতে হবে ।
অরন্যর ভালবাসা অরন্য অবশ্যই প্রকাশ
করবে । লাবণী হ্যা করুক আর নাই করুক ,
শুধু জানাতে চায় যে এই
পৃথিবীতে অরন্যর শেষ নিশ্বাস
পর্যন্ত অরন্য লাবনীকে ভালবাসবে ।
প্রেম নিবেদনের জন্য সেই সাহস
এখন আর অরন্যর মনে নেই । তাই এক
বোতল ভোদকা গলাধঃকরণ করলো ।
অরন্য এখন লাবনির দুইতালা বাসার
বারান্দার
গ্রিলে ধরে দাঁড়িয়ে আছে । চোখ
লাল হয়ে আছে , মাথার চুল
উশকোখুশকো হয়ে আছে । হাত
এবং শরীর ক্রমাগতভাবে কাপছে ।
যেকোনো সময়
পড়ে যেতে পারে দুইতালা থেকে
নিচে ।
আগে থেকে কুড়িয়ে আনা ঢিল
লাবনীর কাছের
আলমারিতে মারলো ।
সরাসরি লাবনীর
গায়ে মারতে পারতো কিন্তু
লাবনীকে আঘাত করা অরন্যর
পক্ষে সম্ভব না । লাবণী ঘুম
থেকে উঠলো । তারপর চিৎকার
দিতে গিয়েও মুখ
সামলিয়ে আস্তে আস্তে
বারান্দায় চলে আসল ।
লাবনিঃ এত রাতে বারান্দায়
ঝুলতেছ কেন ? সমস্যা কি ?
অরন্যঃ সমস্যা একটাই । তোমার
কথা কখনই ভুলতে পারি না ।তোমার
প্রেমে পড়ে গেছি । যেখানেই
তাকাই শুধু তুমি আর তুমি । যেখানেই
যাই শুধু তোমার হাত খুঁজি ধরার জন্য ।
পড়তে বসলে তোমার
কথা মনে পরে । আর যখন সবকিছু বাদ
দিয়ে ঘুমাতে যাই তখন
তুমি স্বপ্নে এসেও হানা দাও ।
এসে সেই ভুবন ভুলানো হাসি দাও
আমার দিকে তাকিয়ে ,
আমি তো তখনই প্রেমে পড়ে যাই ।
লাবণীঃ অরন্য
তুমি জানো রোহিতের
সাথে আমার রিলেশন আছে ।
তাহলে এই পাগলামির মানে কি ?
অরন্যঃ কারন
আমি তোমাকে ভালবাসি । ওই
রোহিত থেকে অনেক
বেশি ভালবাসি । সবার
থেকে বেশি । তোমাকে প্রথম
দেখাতেই প্রেমে পড়ে যাই ।
তুমিই প্রথম প্রেম , তুমিই শেষ ।
লাবনিঃ প্রথম প্রেম বলতে কিছু
নেই । প্রেম বারবার হতে পারে ।
অরন্যঃ তাও ঠিক । আমার
জীবনে প্রেম একটাই । কিন্তু
ফিরে আসে বারবার । যতবার
তোমাকে ভুলে যেতে চাই , ততবার
আরো বেশি করে প্রেমে পড়ি ।
লাবনিঃ অরণ্য , তুমি আমার ভাল বন্ধু
। তোমার ভালর জন্যই বলছি ।
আমাকে ভালবেসে কোন লাভ
হবে নাহ । শুধু কষ্টই পাবে । তাই ভাল
হয় যদি ভুলে যেতে পারো ।
অরন্যঃ দি লাভ ক্ষতি হিসাব
করে প্রেমে পড়তাম
তাহলে তো আর
তোমাকে ভালবাসতাম না ।
তোমার ওই চোখ দুটা , ওই
হাসিটা আমাকে প্রেমে ফেলে
দিয়েছে । এই প্রেম
থেকে আমি কি পাব
তা কখনো চিন্তা করি নি ।
চিন্তা করতে চাইও না । আমি শুধু
জানি যে লাবণী নামের
একটা মেয়েকে আমার জীবনের সব
প্রেম , ভালবাসা দিয়ে দিয়েছি ।
পারলে আমার এই জীবনটাও
দিয়ে দিতাম । একবার এই প্রান
চেয়ে দেখো , জায়গায়
দাঁড়িয়ে থেকে তোমার হাতে এই
প্রান তুলে দিব ।
লাবনিঃ বাসায় গিয়ে একটা ঘুম
দাও । সকালে উঠে দেখবে সব
পাগলামি চলে গেছে । এই
এইজে প্রেম হয় না , এটা শুধু
কিছুদিনের ইমোসন । কয়েকদিন
পরে চলে যাবে ।
অরন্যঃ ( লাফ দিয়ে নিচে নেমে ,
চিৎকার করতে করতে ) লাবণী , শুধু
জানাতে এসেছিলাম আমার মনের
কথা । শুধু জানাতে এসেছিলাম
যে এই পৃথিবীতে কেউ একজন তার
শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত
তোমাকে ভালবাসবে । তুমি চাও
না চাও আমি তোমাকে ভালবাসব
। এর কারন এই না যে অন্য কোন
মেয়ে পাই না । এর কারন এই
যে তুমি আমার প্রথম প্রেম ,
এবং শেষ । মরার আগ মুহূর্তেও বলব
"লাবণী আমি তোমাকে ভালবাসি
" , আই প্রমিস ।
লাবনিঃ টাটা।
অরন্যঃ নেভার স্যা নেভার
লাবণী । এই জীবন অনেক বড় । একবার
না একবার তো দেখা হয়েই যাবে ।
তিন বছর পরঃ
আমরা পিকনিকে যাচ্ছি ।
কক্সবাজার থেকে এখন সেন্ট
মার্টিন যাচ্ছি । ৩০ জন
ছাত্রছাত্রী এবং ২০ জন শিক্ষক ।
সাথে আমি, অরণ্য , রোহিত
এবং লাবণী । হ্যা , লাবনীকে অরণ্য
এখনো ভালবাসে । এখনো লাবনীর
রোহিতের সাথে সম্পর্ক আছে ।
কিন্তু এখন আরো অনেক
বেশি ভালবাসে । এখনও এক মুহূর্তের
জন্য লাবণী অরণ্যর মন থেকে যায়
না । ও অরন্যকে ভালবাসুক না বাসুক
অরণ্যর ভালবাসা দিন দিন বেড়েই
যাচ্ছে ।
রোহিত আর
লাবনীকে দেখা যাচ্ছে । লঞ্চের
ছাদের উপর । ওরা টাইটানিকের
পোজ দিতে চাইছে । অরন্য
আমাকে বলল " গাধায় এটাও
জানে না যে টাইটানিকের
পোজে ছেলেকে পিছনে
দাড়াতে হয় " । আরে ওরা কোথায়
যাচ্ছে ? একেবারে লঞ্চের উপরের
ছাদে চলে গেলো ওরা । কেউ নেই
ওইখানে । জায়গাটা একটু বিপদজনক ।
লাবনীর হাত ধরে রোহিত একবার
ওকে ঘুরাল । ওরা নাচছে ।
আস্তে আস্তে নাচার
গতি বাড়তে থাকল । রোহিত
লাবনীর হাত
ধরে ঘুরিয়ে বামদিকে নিলো
তারপর অন্যহাত দিয়ে আবার
সামনে আনলো । তারপর একহাত
দিয়ে দূরে ঠেলে দিয়ে আবার
কাছে আনলো ।
কাছে এনে লাবনীকে কোলে
নিতে চাইলো । রোহিত ভারসাম্য
রাখতে পারলনা । রোহিত
ধাক্কা খেয়ে পিছনে সরে গেলো
। তারপর রোহিত ঘুরে গেলো । ওর
সামন চলে গেলো রেলিঙের
দিকে । লাবণী এখনও রোহিতের
কোলে । রেলিঙে রোহিতের
হাত ঝারি খেলো । রোহিত
হাতে ব্যাথা পেয়ে লাবনীকে
হাত থেকে ছেড়ে দিলো । নাহ !!!
লাবণী সোজা তিনতলা থেকে
একেবারে নিচে পানিতে পড়ে
গেলো । "রোহিত" , রোহিত" ,
বলে চিৎকার করতে থাকল । রোহিত
নিচে নেমে গেলো । ৩০ জন ছাত্র
ছাত্রি এবং ২০ জন শিক্ষকের সবাই
রেলিঙের পাশে চলে এল ।
লাবণী শ্বাস নিতে পারছেনা ।
একবার ডুবছে আবার ভাসছে । এখনও
লাবণী "রোহিত , রোহিত"
বলে চিৎকার করছে । আর রোহিত
চিৎকার করছে "কেউ
লাবনীকে বাচাও , কেউ একজন
বাচাও" । তারপর আরেকটা ঝাপের
শব্দ শুনলাম । দুইতলা থেকে কেউ
একজন ঝাপ দিয়েছে ।
হয়তো রোহিতের চিৎকার শুনেই
লাফ দিয়েছে । নাহ , যে লাফ
দিয়েছে সে রোহিতের চিৎকার
শুনে লাফ দেয় নি । সে লাফ
দিয়েছে তার ভালবাসার জন্য ।
অরন্য দুইতলা থেকে লাফ
দিয়েছে পানিতে । আর আমার
মাথায় শুধু একটা কথাই এল "অরণ্য
সাতারের কিছুই জানে না" ।
৭ দিন পর: অরণ্য এখনো কোমায়
আছে । ডাক্তার বলেছেন ওর
ফুসফুসে নাকি পানি ঢুকেছে ।
পানি না বের করলে ওর শ্বাস
নিতে সমস্যা হবে । আবার কোমায়
থাকলে অপারেশনও
করা যাবে না । যখন
কোমা থেকে ফিরে আসবে ঠিক
তখনই অপারেশন করা লাগবে ।
লাবণী এই সাত দিন
ধরে হাসপাতালে বসে ছিল ।
আমি যখন খাবার নিয়ে ওর
কাছে আসলাম , ও আমাকে বলল , "
আমি একটু অরণ্যকে দেখতে পারব ? " ।
আমি কিছুক্ষন ওর চোখের
দিকে তাকিয়ে রইলাম । ওর
চোখে যা দেখলাম তা কখনও
আগে ওর চোখে দেখিনি ।
রোহিতের সাথে থাকার সময়
তো কখনোই দেখি নি ,
দেখেছিলাম শুধুই বিভ্রান্তি ।
আজকে দেখলাম অন্য কিছু , পবিত্র ।
লাবণী অরণ্যের বেডের
পাশে বসে আছে । অরণ্য জীবন মৃত্যুর
মধ্যে । আর লাবণী নেই ওর নিজের
মধ্যে । লাবণী কথা বলা শুরু করল ।
অরণ্য , জানি না তুমি কোন সময়
জেগে উঠবে । যত দেরিই কর
না কেন , আমি তোমার অপেক্ষায়
থাকব । তোমাকে অনেক কিছু বলার
আছে , অনেক কিছু অরন্য । ৩ বছর
আগে তুমি বারান্দায়
ঝুলে যে কথা গুলো বলেছিলে আর
আমি হেসেছিলাম সেই
কথা গুলো আজকে তোমাকে বলতে
চাই । এই রকম অনুভূতি আমার কখনও হয়
নি । কি রকম একটা ব্যাথা মনের
ভিতর । কিছু একটা হারানোর ভয়
সারাক্ষন । আমি এই ব্যাথা নিয়ে ২
দিনও থাকতে পারবনা । তুমি ৩ বছর
ধরে কিভাবে থাকলে ? এই অরন্য ,
শুনছো ? শুধুমাত্র ভালবাসলেই এই
ব্যাথা সহ্য করা যায় ।
আমি কি করতে পারব ?
অরন্য জেগে উঠল ।
আস্তে আস্তে বলল , " লাবণী ভাল
আছো ? "
লাবণী কেঁদে ফেলল । অশ্রু
লোকানোর
কোনো চেষ্টা করলনা ।
অরন্যঃ আমি তো শুধু কেমন আছ
জিজ্ঞেস করলাম । এতে কাঁদার
কি হল ?
লাবনীঃ ( নিশ্চুপ ) ।
অরন্যঃ "লাবনী , আমি বলেছিলাম
না আমি তোমাকে জীবনের শেষ
মুহূর্ত পর্যন্ত ভালবাসবো ?
আমি আমার
কথা রেখেছি লাবণী । আমি এখনও
তোমাকে ভালবাসি ।
লাবণী শেষবারের মত বলি ,
আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি ।
যাই লাবণী , ভাল থেকো " ,
বলে অরণ্য লাবণীর
গালে আস্তে করে একটু হাত
দিয়ে ছুঁতে চাইল । লাবণী গাল
বাড়িয়ে দিলো । কিন্তু অরণ্যর হাত
লাবণীর গাল স্পর্শ করার আগেই
থেমে গেলো ।
অরণ্যকে মরে গিয়ে প্রমাণ করতে হল
যে সে ঠিকই
লাবণীকে ভালবাসে ।
তিন দিন পরঃ আমি লাবনীর
বাসায় গেলাম । লাবণী ওর
রুমে দরজা লাগিয়ে বসে আছে ।
আমি ঢুকলাম রুমে । " লাবণী , অরন্য
মারা যাবার পর ওর বেডে এই
ডায়রিটা ছিল । এর শেষ পৃষ্ঠায়
লেখা ছিল যে ডায়রিটা যেন
তোমাকে দেয়া হয় । তাই
দিতে আসলাম " , বলে আমি হাত
বাড়ালাম ।
লাবণী আমার হাত
থেকে ডায়রিটা নিলো । প্রথম
পাতা উল্টানোর পরেই সেই লাল
গোলাপটা দেখতে পেলো যা
হাতে নিয়ে অরন্য
লাবনীকে প্রেম নিবেদন
করতে চেয়েছিল । গোলাপ
মজে গেছে কিন্তু গোলাপের
মধ্যে গন্ধ রয়ে গেছে । তিন বছর
আগের গোলাপ এখনো গন্ধ
রয়ে গেছে !
লাবণী গোলাপটাকে নাকের
কাছে নিয়ে তীব্রভাবে গন্ধ
নিতে চাইল । তারপর চোখ বন্ধ
করে ফেললো । চোখ যখন খুলল তখন দুই
ফোটা অশ্রু লাবণীর গাল
বেয়ে ঝরে পড়ল । লাবণী পড়তে শুরু
করল । প্রথম লাইন এইভাবে শুরু হল " একটু
আগে লাবনী গেলো । রিকশায়
করে , লাল জামা পড়ে ......... " ।
লাবনীর চোখ বেয়ে আবারও
পানি ঝরল । এবার
আরো বেশি পরিমাণে ।
লাবনী ডায়রিটাকে বুকের
কাছে নিয়ে শক্ত
করে ধরে কেঁদে উঠল ।
লাবণী কান্না থামাতে চাইল
না । আজ যত অশ্রু ঝরার ঝরবে । আজ
লাবনীর কাঁদার দিন । লাবণী আজ
কাঁদবে ।
Comments
Post a Comment